Friday, April 30, 2021

ভালোবাসার টাইম ট্রাভেল

ভালোবাসার টাইম ট্রাভেল



ঢাকায় আমি তখন নতুন, নতুন কলেজ জীবন। বনশ্রীর একটা ফ্ল্যাট বাসা ভাড়া নিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করে উঠে পরলাম। আমি আর রাসেল একসাথে থাকতাম। রাসেল আমার ছোট বেলার বন্ধু। তবে সে যখন ক্লাস নাইনে উঠল তার বাবা তাকে ঢাকার একটি স্কুলে ভর্তি করে দেয়। অনেক দিন পর বন্ধুর সাথে দেখা হওয়ায় টই টই করে ঘুরে বেড়াই। দিনকাল এমনভাবেই চলছিল তখন।

তবে একদিন সকালে রাসেল এসে ডাকায় তাড়াহুড়ো করে রওনা দিতে হলো। বেচারার কলেজে নাকি আজ নববর্ষের অনুষ্ঠান। তার থেকেও বড় কথা আজ রাসেল মিতুকে প্রপোজ করবে। রাসেল আর মিতুর বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রায় এক বছর। এতটা সময় মিতুর সাথে থাকতে থাকতে কখন যে মিতুকে সে ভালোবেসে ফেলেছে সেটা সে নিজেই জানে না। আজ রাসেল প্রপোজ করবে—তাই কীভাবে কী করতে হবে সব দায়িত্বটাই আমার উপরে দেওয়া হলো। তাই পরিকল্পনা মতো দেরি না করেই রওনা দিলাম।

গাড়িতে উঠলাম। রাস্তায় জ্যাম। তার ওপর আবার প্রচন্ড গরম। আমি গরম সহ্য করতে পারি না। তাই মনে মনে বকছিলাম রাসেলকে—শালা প্রেম করবি তুই আর সব করব আমি।

গাড়ি থামল। হেঁটে হেঁটে গেলাম রাসেলের কলেজের সামনে, গেইটে ইয়া বড় করে লেখা 'সরকারি বিজ্ঞান কলেজ'। কথামতো ক্যাম্পাসে হাজির মিতু, থুক্কু শুধু মিতু না তাদের বান্ধবীরাও তার সাথে। তাদের মধ্যে একজনকে খুব ভালো লাগছিলো আমার, তার চোখগুলোও ছিল খুব সুন্দর—পরক্ষনেই তার নাম দিলাম অপরূপা। একবার তাকাতেই মনটা জুড়িয়ে গেলো। ভাবলাম আরো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকবো অপরূপার দিকে কিন্তু রাসেল—সে থাকতে দিলো না। পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলছে, দোস্ত, কিছু একটা কর, যেভাবেই হোক তাঁর সাথে কিছু একটা করিয়ে দে।

এই যে, 'কিছু একটা করিয়ে...' দেওয়ার সাধ্য যে আমার নেই তা রাসেলকে কখনোই বুঝানো সম্ভব না। তবে কথা যখন দিয়েছি সেটা তো করতেই হবে। তাই বেশি দেরি করলাম না। বুকভরা সাহস নিয়ে এগিয়ে গিয়ে চোখগুলো বন্ধ করে বলেই ফেললাম—এই মিতু, রাসেল তোমাকে পছন্দ করে। হুশ ফিরলে অনুভব করলাম আমার কপাল থেকে ঘাম ঝরছে। চোখ মেলে দেখলাম মিতুর বান্ধবীরা হাসাহাসি করছে। কি জন্য হাসছে সেটা বুঝতে আমার দেরি হয়নি, এমন একটা ছেলে কথা বলতে গিয়ে ভয়ে যার কি-না শার্টটা ভিজে যায় তাকে দেখে না হাসাটাও কেমন জানি বোকামি।

কিছুটা লজ্জিত অনুভব করার সময় মিতুর সেই অপরূপা বান্ধবী কানের কাছে বলে গেলো বিকালে যেন রাসেলকে নিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানে ঘুরতে আসি। হাতে যেনো একটা আলাদীনের চেরাগ পেয়ে গেলাম, আর আটঁতে লাগলাম অপরুপাকে পটানোর নিন্জা টেকনিক।

খুশিতে আত্মহারা হয়ে যখন বোকার মতো লাফ দিয়ে উঠলাম, মনে হলো রাসেল নয় বরং আমিই প্রেম করার চান্স পেয়ে গেছি। রাসেলের দিকে তাকিয়ে মিতু যখন কিছুটা মুচকি হেসে পাশ দিয়ে চলে গেলো—বুঝতে পারলাম ঢাকায় আসার পর আমার ফার্স্ট মিশন কমপ্লিট।

তখন বিকেল সাড়ে তিনটা। রাসেলকে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম আমি, আমার যাওয়ার উৎসাহ দেখে রাসেল খানিকটা অবাক। হয়তো মনে মনে বলছে, প্রেম কী আমি করতে যাচ্ছি, নাকি সে। ওর ভাবাভাবির শেষ পর্যন্ত সে খানিকটা চুপ করেই ছিল। সবে বাসে উঠে এক ভদ্রলোকের পাশে বসে পড়লাম আমি। আচমকা কেমন জানি ঘুম ঘুম পাচ্ছিল চোখে। মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই ডুব দিলাম ঘুমের সাগরে। অপরূপার চেহারাটা চোখে ভাসছে তখন; কী সুন্দর চোখ—যেন হরিণীর মতো।

চোখ মেলেই দেখি একটা ইয়া বড় ঘরের ভিতরে আমি। আবিষ্কার করলাম এটা কোন ঘর না, অত্যাধুনিক একটা ল্যাব। ল্যাবে কাজ করছে পাঁচ থেকে দশ জনের একটি দল। কিছুক্ষণ পর আইনস্টাইনের মতো উশখো খুশকো চুল টাইপের একটা লোক আমার সামনে আসলো এবং 'ওয়েলকাম টু বায়োলজি রিসার্চ সেন্টার অব এমআইটি' বলে স্বাগত জানালো। বুঝতে পারলাম আমাকে ঢাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বসেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয় এম আই টি-এর একটি ল্যাবে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু ল্যাবটার প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে আমি হাঁ করে চেয়ে আছি। আমি যখন এসব ভাবছি তখন কে যেন অপরূপাকে আমার সামনে নিয়ে আসলো, আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এতক্ষণ একা থাকতে থাকতে খুব খারাপ লাগছিল, অপরূপা আসায় বুকে সাহস ফিরে পেলাম। এক বস্তা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম তাদের দিকে। উত্তর দিলো এক রোবট। আমিতো আরো অবাক।

-কী করে এলাম!

-সরি স্যার, আপনাকে টাইম মেশিনে করে ভবিষ্যতে নিয়ে আসা হয়েছে। আপনি বর্তমানে এম আই টি-এর ২০৪৫ সালের একটি ল্যাবে অবস্থান করছেন।

-আমাকে ও অপরুপাকে কেন নিয়ে আসা হয়েছে।

-স্যার আমাদের একজন গবেষক এমন দুজনকে খুঁজছিলেন যারা দুজন দুজনকে ভালোবাসে কিন্তু এখনো কোনো সম্পর্কে জড়ায়নি। তারপরই আপনাদেরকে পায়। আসলে আমরা দেখতে চাচ্ছিলাম তাদের মস্তিষ্কে আসলে কী চলছে সেটা দেখার জন্য।

- আপনারা কীভাবে বুঝলেন আমি অপরুপাকে ভালোবাসি আর অপরুপা আমাকে ভালোবাসে।

- স্যার আমরা আপনার ও অপরূপার চোখে একে অপরের প্রতি মায়া অনুভব করতে দেখেছি। সেটা পরীক্ষা করার জন্য আমরা আপনাদের চোখের একটি স্ক্যান কপি নিয়ে নিই এবং সেটা ব্যাবহার করে বুঝতে পারি আপনি এবং অপরূপা একে অপরের প্রতি মায়া অনুভব করছেন। (আমি যেন কিছুটা লজ্জিত হয়ে গেলাম)

- আমরা যে ভবিষ্যতে এসে পড়েছি আমরা কী আবার বর্তমানে ফিরে যেতে পারবো?

- অবশ্যই স্যার। তবে আপনাদের মস্তিষ্ক আমরা এখন পরীক্ষা করবো, তারপরই।

- পরীক্ষা করে কী জানা যাবে? অপরূপা আমাকে ভালবাসে কি না তা জানতে পারবো?

- অবশ্যই স্যার আমরা এর মাধ্যমেই আপনাদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করবো। আপনি জানতে পারবেন অপরূপার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা ও ভালো লাগার বিষয়গুলো আর অপরূপা জানতে পারবে আপনার সাথে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা, এমনকি সেটা অনুভবও করতে পারবেন তিনি।

- এরকম সুযোগ ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না, আমি জানতে চাই অপরূপার সাথে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা আর ভালোলাগা। তাই কিছু না ভেবে বলেই ফেললাম—তাহলে দেরি কেন করছেন, যা করার তাড়াতাড়ি করুন।

- স্যার আমরা আপনার অপরুপাকে নিয়ে জানার যে আগ্রহ—সেই আগ্রহ সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। আমরা খুব তাড়াতাড়িই ব্যাবস্থা করছি।

রোবট আর আমার কথাবার্তা শুনে অপরূপা প্রায় লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। আমিও তার দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারিনি, কেমন যেন লজ্জা লাগছিলো।

আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে অপরূপাকে।আহা, এই প্রযুক্তিটা যদি ভবিষ্যতে না থেকে বর্তমানে থাকতো তাহলে সবার মনের কথাগুলো জানতে পারতাম!

মস্তিষ্ক পরীক্ষা করার জন্য আর একে অপরের মনের কথা জানার জন্য আমাদেরকে নিউরাললিঙ্ক এক্সেস দিতে হলো আমার আর অপরূপার মস্তিষ্কে চিপ প্রবেশ করানোর মাধ্যমে।আমরা দুজনেই অনুভব করতে লাগলাম একে অপরের প্রতি মায়া ও ভালোবাসা। আমি যা ভাবছি অপরূপা তা জানতে পারছে, আর আমি জানতে পারছি আমার প্রতি অপরূপার মায়া আর মমতা। বুঝতে পারলাম আমার দাঁড়ানোর স্টাইলে ঘেমে যাওয়া খুব মুগ্ধ করেছে অপরূপাকে। এখন খুলে দেওয়া হলো চিপটা। অনুভব করলাম কেউ একজন আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে, বুঝতে পারলাম সে আর কেউ নয়—অপরূপা।

প্রোগ্রামিং ভালোবাসি আর ধর্মকে সাথে করে বাঁচতে চাই।অন্যায় আর অধর্মকে ঘৃণা করি।বইয়ের সাথে আমার প্রচুর ভাব। আমার প্রফেশনাল পরিচয় হলো "কম্পিউটারের পোকা"।

0 Comments: